প্রচ্ছদআইটি বিশ্বমিশ্র-শিখন পদ্ধতির যুগে বাংলাদেশ

মিশ্র-শিখন পদ্ধতির যুগে বাংলাদেশ

বাড়ি ও এলাকাভিত্তিক শিখনের ওপরও জোর দেওয়া যেতে পারে -ড. এম তারিক আহসান

মিশ্র-শিখন পদ্ধতির যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। লেখাপড়ার একটি অংশ শিক্ষার্থীদের সরাসরি ক্লাসরুমে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাকিটা দেওয়া হচ্ছে অনলাইন ও দূরশিক্ষণ মাধ্যমে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এভাবে গোটা পাঠ আলাদা মাধ্যমে নিশ্চিতের নামই ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ বা মিশ্র শিখন।

গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর সরকার ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে ওই মাসেরই শেষদিকে প্রথমে মাধ্যমিক স্তরের পাঠদান দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে টেলিভিশনে শুরু করা হয়।

পরে প্রাথমিক স্তরের পাঠদানও শুরু হয়। এরপর অনলাইনে মেসেঞ্জার গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকলাইভ এবং পরে জুম ও স্টিমইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করেও লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়া হয়। দেড় বছর এভাবে চলার পর ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে।

এখন সরাসরি ক্লাসরুমের পাশাপাশি অনলাইন ও দূরশিক্ষণেও পাঠদান চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম তারিক আহসান বলেন, দুর্যোগ-মহামারির মতো বিশেষ সময়ে ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতির প্রয়োগ একটি কার্যকর পন্থা। তবে এ পদ্ধতি প্রকৃত অর্থে কার্যকরভাবে প্রয়োগে বাড়ি ও এলাকাভিত্তিক শিখনের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালানো হচ্ছে। এটা এক ধরনের ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’। এই পদ্ধতির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মূল লক্ষ্য থাকে সব ছাত্রছাত্রী যেন শিখন প্রক্রিয়ার আওতায় থাকে।

কিন্তু আমাদের দেশের অবকাঠামোগত পদ্ধতিতে সব শিক্ষার্থীর কাছে ইন্টারনেট বা টেলিভিশন-বেতারের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতিতে আরও দুটি যুক্ত থাকে। সেগুলো হচ্ছে, ‘হোমবেসড লার্নিং’ (বাড়িভিত্তিক শিখন) এবং ‘কমিউনিটিবেসড লার্নিং সার্কেল’ (এলাকাভিত্তিক শিখনচক্র)।

যদি এই দুটিও প্রবর্তন করা হতো তাহলে ‘মিশ্র-শিখন’ পদ্ধতি যেমন পূর্ণাঙ্গতা পেত, পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থীই লেখাপড়ার বাইরে থাকত না। নতুন শিক্ষাক্রম রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে এবং মহামারি ও দুর্যোগে ব্লেন্ডেড লার্নিং যথার্থ অর্থে প্রয়োগ হবে বলে জানান তিনি।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ২০২১ ও ২০২২ সালের এসএসসি ও এইচএসসি এবং পঞ্চম শ্রেণির পিইসি পরীক্ষার্থীদের সপ্তাহে প্রতিটি কর্মদিবসেই ক্লাস হবে। প্রথম থেকে চতুর্থ এবং ষষ্ঠ থেকে নবম ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একদিন ক্লাস চলছে।

এসব শিক্ষার্থীকে আগের মতো অনলাইনে শেখানোর কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি টেলিভিশনেও আগের মতো পাঠদান চলছে।

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, ইন্টারনেটের বিদ্যমান সেবা ব্যবস্থা এবং সার্বিক অবকাঠামোগত পরিস্থিতির কারণে অনলাইনে পাঠদানের আওতায় সব শিক্ষার্থীকে আনা সম্ভব হয়নি। আবার সব শিক্ষার্থীর বাসায় টেলিভিশন না থাকায় সরকারি দূরশিক্ষণ উদ্যোগের সুফলও পায়নি তারা।

কোভিড কালীন শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ার ওপর বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা সমীক্ষা করেছে। এর মধ্যে গণসাক্ষরতা অভিযানের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ও দূরশিক্ষণ বা বেতার, টেলিভিশন, অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফরম এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেওয়া পাঠদানের আওতায় এসেছে।

যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ৯২ শতাংশ আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী টেলিভিশনের পাঠদানের আওতায় এসেছে। আর ১০ মে প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্সের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণা বলছে, প্রাথমিকের ১৯ আর মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনার বাইরে।

দূরশিক্ষণের জন্য যেসব সুবিধা থাকা দরকার, তা আছে বা ব্যবহার করছে মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী।

এদিকে অভিভাবকরা বলছেন, যদিও করোনার প্রাদুর্ভাব এখনো আছে, এরপরও মাত্র একদিন ক্লাস করে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম কীভাবে শেষ হবে তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। কেননা সব জায়গায় অনলাইন পাঠদান হচ্ছে না।

টেলিভিশন ও বেতারের পাঠও শিক্ষার্থীদের কাছে আশানুরূপ পৌঁছাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় সরাসরি পাঠদানের দিনসংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলেছেন কেউ কেউ।

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় অভিভাবক কামরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার সন্তান সপ্তাহের বাকি ৪ কর্মদিবস অনলাইনে ক্লাস করছে। তার বাড়ি ভোলায়।

সেখানে তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, তার ভাইয়ের সন্তানরা অনলাইনে কোনো পাঠ পাচ্ছে না। সুতরাং চিন্তাটা সার্বিকভাবে করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুতে অনলাইনে পাঠদানের আলোচনা আসার পর বিশেষজ্ঞরা বিনা মূল্যে বা স্বল্পসুদে ল্যাপটপসহ ডিভাইস প্রদান, মোবাইল ডেটা ও অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কিনতে অর্থ সহায়তার পরামর্শ দেন।

এরপর ইউজিসি এ নিয়ে উদ্যোগ নেয়। ইউজিসি সচিব (চলতি দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামান বলেন, আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষার্থীকে ডিভাইস কেনার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে বিশেষায়িত ডাটা প্যাকেজের চুক্তি করেছি। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নিয়েছেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রতন চন্দ্র পণ্ডিত জানান, পঞ্চম শ্রেণি বাদে বাকি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আমরা সপ্তাহে একদিন ক্লাসে আনছি। যাদের আনতে পারছি না তাদের জন্য আগের মতোই পাঁচ দিন টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার করা হবে।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের যে ওয়ার্কশিট (বাড়ির কাজ) দেওয়ার কথা সেটা দেবেন। প্রায় একই কথা বলেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক অধ্যাপক প্রবীর কুমার ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। টেলিভিশনের পাঠদান চলছে। যেখানে অনলাইনে পাঠদানের সুবিধা আছে সেখানে তারা সেটা চালিয়ে যাবেন। এছাড়া আরও কী করণীয় আছে সেটা ভাবা হচ্ছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত

সর্বশেষ